সব সংবাদ
ফেনী

বাবা: যিনি নীরবে গড়ে তুলেছেন আমার পৃথিবী

বাবা দিবসে এক সন্তানের আবেগময় স্মৃতি। ইমরান ইমন তাঁর বাবার অসীম ভালোবাসা, ত্যাগ ও সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বাবা নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন না হলেও সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন।

আজ বাবা দিবস। সমাজ, রাষ্ট্রের নানা বিষয় নিয়ে লিখলেও বাবাকে নিয়ে না লিখলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আমার বাবা আমার কাছে নির্ভরতার আকাশ, বটবৃক্ষের ছায়া, নিরাপত্তার উষ্ণচাদর। পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ থাকতে পারে, কিন্তু কোনো খারাপ বাবা নেই। আমার বাবা একজন আপাদমস্তক দায়িত্বশীল বাবা। ছোটবেলা থেকেই তা দেখে আসছি। পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে আমি পেয়েছি সর্বোচ্চ আদর, ভালোবাসা ও মমতা। আমার মা বলেন, আমার পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়েছে, আমার দুই ছোট ভাইবোন তার অর্ধেকও পায়নি। ছোটবেলায় আমার নেশা ছিল খেলনা গাড়ি কেনা আর ভাঙা। বিশেষ করে বড়ো বাস। একটা কিনে ভাঙতি, আবার কিনে দিতে হতো। এতে বাবা একটুও বিরক্ত হতেন না। আর প্রতিদিন আঙুর ফল না হলে দুনিয়া উল্টে যেত। প্রতিদিন আমার দুই কেজি আঙুর লাগতো। আমি আঙুরকে 'হাম' বলতাম। পারিবারিক দায়িত্বের চাপে বাবা বেশিদূর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে পারেননি। কিন্তু তাঁর মধ্যে যে জীবনবোধ ও মনুষ্যত্ববোধ রয়েছে, তা উচ্চশিক্ষিত মানুষের মধ্যেও দেখা যায় না। তিনি একজন স্বশিক্ষিত মানুষ। তাঁর প্রগাঢ় জীবনবোধ আমাকে প্রতিনিয়ত প্রাণিত করে ও প্রেরণা জোগায়। নিজে বেশিদূর পড়াশোনা না করতে পারলেও সন্তানদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তিনি সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। আমার শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছেন। বাজারের সবচেয়ে বড় মাছটি আমাদের জন্য কিনেছেন। কোথাও কোনো কমতি রাখেননি। প্রাথমিক শিক্ষাজীবন থেকেই গায়ে 'ভালো ছাত্রের' তকমা ছিল। সবসময় ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিলাম। ষষ্ঠ শ্রেণিতে প্রয়াত চেয়ারম্যান একরামুল হকের পিতা মাস্টার নুরুল হকের নামে একটা বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি এবং ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাই। বৃত্তির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বাবাও গিয়েছিলেন। সেদিন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ লোক ও হাজার হাজার মানুষের সামনে সংবর্ধনা নিতে বাবাও মঞ্চে উঠেছিলেন। সেদিনই প্রথম বাবার চোখে আনন্দের অশ্রু দেখেছি। এরপর প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সাফল্যে বাবা আনন্দিত। মানুষ যখন বলেন, আপনার ছেলেকে এই জায়গায় দেখেছি, বাবা তখন নিজেকে সফল পিতা মনে করেন। আমার লেখালেখি নিয়ে মানুষজন যখন প্রশংসা করেন এবং বলেন, আপনার ছেলে দারুণ লেখক, আমাদের এলাকার গর্ব — তিনি বেশ সুখ অনুভব করেন। কিছুদিন আগে হেসে বললেন, আমি ইমরান ইমনের বাবা বলে এখন অনেকে গুরুত্ব দেয়। তখন নিজেকে সফল সন্তান মনে করলাম। মনে হলো, একটু হলেও বাবার ঋণ শোধ করতে সক্ষম হয়েছি। মানুষ হিসেবে বাবা একজন সৎ, ভালো, অমায়িক মানুষ। এতটা সরল ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষ খুব কম দেখা যায়। পরোপকার তাঁর ধর্ম। যার যেকোনো বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। মানুষকে আপ্যায়নের ব্যাপারে তিনি সেরাদের সেরা। মানুষের জন্য খরচ করা নিয়ে পরিবারে মায়ের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ঝামেলাও হয়। কিন্তু পরোপকার যার ধর্ম তাঁকে আটকিয়ে রাখা যায় না। এ কারণে ব্যবসায়িকভাবে তিনি তেমন অর্থকড়ি বানাতে পারেননি। এ নিয়ে তাঁর কোনো আফসোস নেই। তিনি বলেন, তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে তাঁর বড় সম্পদ। বড়ছেলে হিসেবে পড়াশোনার বাইরে তিনি আমাকে কোনো জটিলতায় জড়াননি। বাড়িতে যখন থাকি, কোনো দিন আমাকে না ডেকে তিনি খেতে বসেননি। সন্তান হিসেবে আমি বাবাকে নিয়ে গর্ব করি। যাঁর কাছে আমার কোনো দিন কিছু চাইতে হয়নি, চাওয়ার আগেই যিনি দিয়ে যান। গত ছয় বছরে বাবা থেকে এক পয়সাও নিইনি। প্রয়োজন হয়নি বলে। যদিও কোনো কালেই নিইনি, তিনি দিয়ে গেছেন। এই টাকাপয়সা না নেওয়া নিয়েও তাঁর মন খারাপ হয় মাঝেমাঝে। কারণ, আমি আমার আয় দিয়ে নিজে সুন্দরভাবে চলতে পারি। আমি আত্মনির্ভরশীল হবো এবং থাকবো — এই ছিল আমার নিজের প্রতি আমার কমিটমেন্ট। রমজানের ঈদে ঈদসালামি দিলেন। আমি বললাম, আমি তো এখন বড়ো হয়ে গেছি, আমাকে কেন? বাবা বললেন, তোর কাছে তুই বড় মনে হলেও আমার কাছে তুই এখনও সেই ছোট্ট আব্বুনিটা। বাবা আমাকে আদর করে ডাকেন 'আব্বুনি' আর মা ডাকেন 'ইমনি'। বাবার কাছে আমি এখনও সেই ছোট্ট শিশুটি। কয়েকদিন আগে ফেনী থেকে রাত সাড়ে এগারোটায় মুন্সিরহাট এসে পৌঁছলাম। তুমুল বৃষ্টি ঝড়-তুফান শুরু হলো। বাবা ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, আব্বু কোথায় আছো? আমি বললাম, মাত্র গাড়ি থেকে নামলাম, বৃষ্টি শুরু হলো। তিনি তুমুল বৃষ্টি ঝড় উপেক্ষা করে বগলে আরেকটা ছাতা নিয়ে কাকভেজা হয়ে হাজির হলেন আমার সামনে। আমাকে পরম মমতায় উষ্ণতার চাদরে ঘরে নিয়ে আসবেন বলে। বাবার সেদিনের ঘটনায় অনেক শক্ত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আমার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরেছে। আমি গুমরে মরলাম এই ভেবে যে, বাবা ছাড়া আমি কীভাবে থাকবো? যখন তিনি থাকবেন না, তখন কী হবে আমার... আমার বাবা নিজেই বড় বিশেষণ, তাঁর তুলনা একান্ত তিনি নিজেই। বাবার অসীম ঋণ আমার কোনো দিন শোধ করা সম্ভব হবে না। তবে নিজেকে আমি সৌভাগ্যবান মনে করি এই দিক থেকে যে, জীবিত অবস্থায় বাবা আমার সাফল্য দেখতে পেয়েছেন এবং নিজেকে গর্বিত মনে করছেন। আমার বাবার জন্য আমি দোয়া চাই, যাতে তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করেন। বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবার প্রতি অতল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

মূল প্রতিবেদন (Reference): বাবা: যিনি নীরবে গড়ে তুলেছেন আমার পৃথিবী — দ্য ডেইলি স্টার লাইন